BangaliNews24.com

যে কারণে দেশের চামড়া পাচার হতে পারে

যে কারণে দেশের চামড়া পাচার হতে পারে
অগাস্ট ১৮
০০:০৩ ২০১৮

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের তুলনায় দেশের বাইরে যে কোনও পণ্যের ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ থাকলেই সেখানে পাচারের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এই সম্ভাবনা থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশের চামড়া খাতও। এ ছাড়াও বাংলাদেশের কোরবানি করা পশুর চামড়ার গুণগতমান ভালো হওয়ায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য সমাদৃত। অথচ ট্যানারির মালিকরা আন্তর্জাতিক বাজারদর ও লোকসানের অজুহাতে কোরবানির পশুর চামড়ার দর কমিয়ে নির্ধারণে বাধ্য করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি কাঁচা চামড়ার দর ঠিক করে দিয়েছে। গত কয়েকবছর ধরেই ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কাঁচা চামড়ার দর বাড়ায়নি। আর দাম না বাড়িয়ে বরং দাম আরও কমিয়ে দেওয়ার কারণেই চামড়া পাচারের সম্ভাবনা বেড়েছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সারা বছর দেশে জবাই হওয়া পশুর অর্ধেকই জবাই হয় কোরবানির সময়। সারা বছর প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই করা হয়। এর মধ্যে এবছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা এক কোটি ১৫ লাখ। গত বছর কোরবানিযোগ্য পশুর পরিমাণ ছিল এক কোটি চার লাখ। এ বছর কোরবানিযোগ্য গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৪ লাখ ৪৭ হাজার। আর গতবছর ছিল ৪৫ লাখ ২৯ হাজার। এ বছর কোরবানিযোগ্য ছাগল ও ভেড়ার পরিমাণ ৭১ লাখ, আর গতবছর ছিল ৫৮ লাখ ৯১ হাজার।

আসন্ন ঈদুল আজহায় ট্যানারির মালিকরা বাণিজ্যমন্ত্রীকে রাজি করিয়ে ঢাকায় কোরবানির গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, আর রাজধানীর বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। একইভাবে সারাদেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা নির্ধারণ করেছে এবং বকরির প্রতি বর্গফুট চামড়া ১৩ থেকে ১৫ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট কোরবানির গরুর চামড়ার দর ছিলো ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, আর ঢাকার বাইরে দর ছিল ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর সারাদেশে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিলো ২০ থেকে ২২ টাকা ও বকরির চামড়ার দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল ১৫ থেকে ১৭ টাকা। যদিও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন কোরবানির পশুর চামড়ার দর রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫৫-৬০ টাকা, রাজধানীর বাইরে ৪৫-৫০ টাকা, সারা দেশে খাসির চামড়া ২৫-২৭ টাকা এবং বকরির চামড়া ২০-২২ টাকা নির্ধারণে সুপারিশ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় থাকবে বিজিবি। এ জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। চামড়াজাত শিল্পকে রক্ষা করতে বাংলাদেশের চামড়া যাতে বাইরে কোথাও পাচার না হয় সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে আসলেই চামড়ার অবস্থা খারাপ। তাই গতবছরের তুলনায় দাম তো বাড়বেই না বরং কমানো উচিৎ।

যে কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর চামড়ার কম দাম নির্ধারণ করে সেটি ঠিক নয় মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কিনতে সরকার ব্যবসায়ীদেরকে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়। তাই প্রতিবছর কাঁচা চামড়া কেনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের অর্থ সংকটের অজুহাত সম্পূর্ণ সঠিক নয়। এ ছাড়াও সাভারে চামড়া শিল্প নগরীতে প্লট ও অবকাঠামো নির্মাণ করে দিয়েছে। কাজেই লোকসানের অভিযোগ সত্য নয়।

বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেছেন, চামড়া খাতের ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের কোরবানির পশুর চামড়ার দর কমানোর জন্য বলেছি। সরকার আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করেছেন।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর ১৫৫টি ট্যানারিসহ সারাদেশে ছাড়িয়ে থাকা চামড়া খাতের প্রায় তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান পুরো বছরের কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে এবং তা মজুত রাখে। ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ করে। গরুনীতিতে কঠোরতা আরোপের পর ভারতের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার সংকট তৈরি হয় এবং একই সঙ্গে পাচারের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

চামড়া ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, চামড়া কেনার চুক্তি সেরে ফেলেছে পাশের দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণের পর থেকেই কিছুটা বেশি দাম দেওয়ার শর্তে আড়তদারকে দাদন দিয়েছে। তাই চামড়া পাচারের আশঙ্কা করছেন তারা।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, চামড়া কেনার জন্য সরকার ঋণ দিলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ভারতের ব্যবসায়ীরা সহজ শর্তে পর্যাপ্ত ব্যাংকঋণ পায়। বাংলাদেশে সে সুযোগ নাই। তাই আমাদের কম দামে চামড়া কেনার সুযোগ না দিলে ক্ষতির সম্ভবানা থাকে।

এদিকে কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির দিন থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে সীমান্ত দিয়ে কোরবানির পশুর চামড়া পাচার শুরু হয়। এ বছর তাই সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে আগাম পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বাঙালিনিউজ২৪কে জানিয়েছেন, কোরবানির পশুর চামড়া একটি সম্পদ। বাংলাদেশের চামড়ার গুণগতমান ভালো হওয়ায় এর পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে বিধায় সরকার তা রোধে পদক্ষেপ নিয়েছে। সীমান্তে আগে থেকেই নজরদারি থাকবে। এ ছাড়া পাচাররোধে অতিরিক্তি জনবলও নিয়োগ দেওয়া হবে। আশা করছি এক পিস চামড়াও পাচার হবে না।

বিশেষ সূত্র জানায়, বাংলাদেশের দিকে সোনা মসজিদ, বেনাপোল, আখাউড়া ও হিলি স্থলবন্দর এবং ভারতের দিকে হরিদাসপুর, জয়ন্তীপুর, বানোবেরিয়া, সুটিয়া, বাঁশঘাট, কালীরানী, আংরাইল এবং এর আশপাশের এলাকা দিয়ে চামড়া পাচারের আশঙ্কা বেশি।

অন্যান্য খবর

BangaliNews24.com