BangaliNews24.com

সিরাজগঞ্জে যমুনায় নদী ভাঙন বহু স্থাপনাসহ ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন

সিরাজগঞ্জে যমুনায় নদী ভাঙন বহু স্থাপনাসহ ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন
জুলাই ২৭
০১:৪৩ ২০১৮

মাহমুদুল কবীর,বিশেষ প্রতিনিধি : সিরাজগঞ্জে যমুনায় পানি বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে নদী ভাঙন বেড়েছে। কাজিপুর উপলোর শুভগাছা, বাঐখোলা, পাটাগ্রাম ও সিংড়াবাড়ি পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকায় নদী ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এরমধ্যে শুভগাছাতে নদী ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকার ফসলী জমি,বাড়িঘর স্কুল গাছগাছালি যা ছিল তার অর্ধেকেরও বেশি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় হুমকির মুখে রয়েছে আরো কয়েক হাজার হেক্টর ফসলী জমি, হাজার হাজার ঘরবাড়িসহ বহু স্থাপনা। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ভয়ে উৎকন্ঠায় রয়েছে এলাকার মানুষ। সিংড়াবাড়ি থেকে শুভগাছা পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার অংশে কিছু বস্তা ফেলে ভাঙনের গতি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্প আকারে বরাদ্দ ছাড়া ভাঙন প্রতিরোধে টেকসই প্রতিরক্ষামূলক কাজ করতে পারছেনা পাউবো।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের চেষ্টায় কাজিপুর উপজেলার খুদবান্দি থেকে সদর উপজেলার বাহুকা পর্যন্ত এলাকা যমুনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে ৪৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। এই ৪৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পের অধীনে যমুনার ভাঙন প্রতিরোধে নদীর তলদেশে ড্রেজিং করে গভীরতা বাড়িয়ে গতি প্রবাহ সচল করতে কাজিপুরের মেঘাই স্পার থেকে ভাটির দিকে ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত যমুনা নদীর ড্রেজিং করা হবে। এই কাজে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে এবং প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক কাজ শেষের দিকে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ শহরের রানীগ্রাম থেকে কাজিপুরের ঢেকুরিয়া পর্যন্ত ঝুকিপূর্ণ ২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণবাঁধের চলমান স্লোপিং মেরামত কাজে ১২ কোটি টাকা ধরা আছে। অবশিষ্ট ২৮ কোটি টাকায় মেঘাই-১ ও সিমলা-২ স্পার মেরামত করা হবে।

৪৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে চলতি বছরে কাজিপুরের খুদবান্দি ও সিরাজগঞ্জ সদরের বাহুকা অংশে মোট চার কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ এবং ২৪ কিলোমিটার ঝুকিপূর্ণ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের স্লোপিং মেরামতের জন্য ২০০ কোটি টাকার দরপত্র পক্রিয়া সম্পন্ন করে উভয় কাজ বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যা দিয়ে ঝুকিপূর্ণ ২৪ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের স্লোপিং মেরামত কাজ চলছে এবং প্রথম দফায় নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক কাজের মধ্যে কাজিপুরে মেঘাই ২নং স্পার হতে খুদবান্দি পর্যন্ত এক দশমিক ছয় কিলোমিটার এবং সদর উপজেলার বাহুকা থেকে শুভগাছা পর্যন্ত প্রতিরক্ষামূলক দুই দশমিক চার কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। সিসি ব্লক ও জিও ব্যাগ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।

কিন্তু সরেজমিনে দেখা যায়, উপরোক্ত প্রকল্প প্রাক্কলনের বাইরের এলাকা শুভগাছা থেকে উত্তরে সিংড়াবাড়ি পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার এলাকা নতুন করে নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে। গত এক মাসের ভাঙনে প্রায় দুই হাজার হেক্টর ফসলি জমি,শতশত বাড়িঘর, মসজিদ, মকতব-মাদরাসা বিদ্যুতের লাইন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিশেষ করে গেল এক সপ্তাহ যাবত শুভগাছাতে ভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ এবং ৩০০ মিটার প্রস্থ এলাকা নদীতে চলে গেছে। এসব এলাকার উঠতি ফসল পাট,তিল,কাউন ও বাদামের ক্ষেতের ফসল ঘরে তুলতে পারেনি কৃষক। শুভগাছা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের বাড়ি, শুভগাছা সরকরী প্রাথমিক বিদ্যালয়,বয়ড়াবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অনেক ঘরবাড়ি নদী তীরে ভাঙন হুমকিতে দাঁড়িয়ে আছে। একই সাথে ভাঙন এলাকার ঘরবাড়ি সরিয়ে বাঁধের ঢালে কিংবা ফসলি জমিতে স্তুপ করে রেখে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন অনেকে। শুভগাছা গ্রামের কৃষক রফিকুল সেখ জানান,এক সপ্তাহের নদী ভাঙনে তার আড়াই বিঘা পাটের ক্ষেত বিলীন হয়েছে আর দেড় বিঘা নদীর তীরে ভাঙ্গার অপেক্ষায়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব মতে চলমান নদীতীর ভাঙনের ফলে আরো পাঁচ হাজার হেক্টর ফসলী জমি, পঁচিশ হাজার ৬০০ পাকা আধা পাকা ও কাঁচা বসতবাড়ি, ৫০টি পুকুর, ৪৫ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন ও ২০টি ট্রান্সফর্মারর ২৫টি হাটবাজার, স্কুল কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, মন্দির, ইউপি অফিস,পরিবার পরিকল্পনা অফিস ও অন্যান্য সরকারী-বেসরকারী ভবনসহ ১৫০টি স্থাপনা, উপজেলা কমপ্লেক্স,উপজেলা হাসপাতাল ও সরকারী খাদ্য গুদাম তিনটি, ৪৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ৬০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, ৩৬টি ব্রিজ ও কার্লভাট, ১৫ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং তাঁত শিল্প মিলে ১৫০০ টি হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। যার গড় বার্ষিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় চৌত্রিশ কোটি টাকা। এছাড়া কৃষি জমি হারিয়ে নদীতীরবর্তিরা দিনদিন বেকার হয়ে পড়ছে। ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করতে অতি দ্রæত স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজের দাবি জানান স্থানীয়রা। শুভগাছা ইউপি চেয়ারম্যান এসএম হাবিবুর রহমান খোকা শুভগাছা থেকে সিংড়াবাড়ি পর্যন্ত নদী ভাঙন থেকে বাঁচাতে সরকারকে অতি দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কাশেম ফজলুল হক জানান ‘যমুনা নদী ভাঙন হতে কাজিপুর উপজেলাধীন সিংড়াবাড়ি,পাটাগ্রাম, বাঐখোলা ও শুভগাছা সংরক্ষণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নদীর তীরবর্তি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনাসমূহ নদী ভাঙন হতে রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই বাছাই ও ব্যয় নিরুপনের কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির জন্য পাউবো’র উর্ধতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি কাজ শুরু করেছেন। তবে ডিপিপি আকারে প্রকল্প অনুমোদন হয়ে তা একনেক পর্যন্ত গড়াতে কমপক্ষে তিন মাস সময় লাগবে। এই তিন মাসে নদী ভাঙনে এলাকা বিলীন হয়ে গেলে কী পদক্ষেপ নিবেন জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন কিছু জিও বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
অপর দিকে জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া, কায়েমপুর, গাড়াদহ ও রূপবাটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ গ্রাম গুলি হল, আহাম্মদপুর, করশালিকা, ছোটবায়রা, শাকতোলা, নুকালি, রাউতারা, পোতাজিয়া, ভাইমারা, রেশমবাড়ি, চিথুলিয়া, কাশিনাথপুর, সড়াতৈল, বনগ্রাম, কাকিলামারী, মাদলা, বাড়াবিল, নলুয়া, বৃ-আঙ্গারু, চর আঙ্গারু ও চুলধরি। এ সব গ্রামের মাঠ-ঘাট বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় কাঁচা ঘাসের অভাবে কৃষকরা তাদের শত শত গবাদি পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে। ফলে বাজারে দানাদার গো-খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সুযোগে খইল,ভুষি ও দানাদান প্যাকেট খাদ্য বিক্রেতারা বস্তা প্রতি ২/৩‘শ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যান্য খবর

BangaliNews24.com